জাতীয়

শ্রমিক অসন্তোষ, যৌক্তিক দাবি মানতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বিজিএমইএর রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে এই একটি খাত থেকে। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এতে বিপুল অবদান সত্তে¡ও শিল্পটির প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট।

মাহমুুদুল হক আনসারী

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ, সংঘর্ষ ও কারখানা বন্ধের কারণে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আশুলিয়া, সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, আশুলিয়া ও গাজীপুরে প্রায় ৫০টি এবং মিরপুরের প্রায় সব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। কয়েকটি স্থানে আহত হওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে কারা জড়িত, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

শ্রমিকদের মজুরি, চাকরির নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সহিংসতা বা অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। কারণ তৈরি পোশাকশিল্প কেবল একটি রপ্তানি খাত নয়; এটি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, শিল্পায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার অভিঘাত অর্থনীতির বহু খাতে ছড়িয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। বিজিএমইএর রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে দেশের মোট পণ্য রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে এই একটি খাত থেকে। তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। এতে বিপুল অবদান সত্তে¡ও শিল্পটির প্রবৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট।

প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষভাবে এই শিল্পে কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। পোশাকশিল্পের বিকাশ নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শহরমুখী কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সুতা, কাপড়, ডাইং, ওয়াশিং, প্যাকেজিং, পরিবহন, বন্দর, ব্যাংক, বীমা ও সেবামূলক খাতও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ সংকট শুধু মালিক বা শ্রমিকের নয়; লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাÐ এর সঙ্গে জড়িত।

বর্তমান শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে বাস্তব অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, খাদ্য, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সীমিত আয়ের শ্রমিকদের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। মজুরি বাড়লেও যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেশি বাড়ে, তাহলে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সাম্প্রতিক আন্দোলনে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, কথিত কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ, ইচ্ছামতো চাকরিচ্যুতি রোধ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিগুলো যৌক্তিক হিসেবে দেখা দরকার। এখানে ৩০ হাজার টাকা শ্রমিকদের দাবি, সরকার অনুমোদিত নতুন মজুরি নয়। শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান বিবেচনায় নিয়ে বিষয়টি দায়িত্বশীল আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শ্রম বিশ্লেষকগন।

মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। শ্রমিককে সম্মানজনক জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি দিতে হবে। আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ওপর এমন ব্যয়চাপ সৃষ্টি করা যাবে না, যা উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ ভারসাম্য নির্ধারণে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে নিয়মিত বেতন পরিশোধ, অতিরিক্ত কাজের যথাযথ পারিশ্রমিক, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং অন্যায় চাকরিচ্যুতি প্রতিরোধে আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

মালিকপক্ষের মনে রাখা প্রয়োজন, শ্রমিক কেবল উৎপাদন ব্যয়ের একটি উপাদান নন; তিনি শিল্পের উৎপাদনক্ষমতা ও প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি। শ্রমিকের নিরাপত্তা, দক্ষতা, কর্মপরিবেশ ও কল্যাণে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়ে। শ্রমিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও দরকষাকষির অধিকার রয়েছে; কিন্তু ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, জোরপূর্বক কারখানা বন্ধ কিংবা অন্য শ্রমিকদের কাজে যোগদানে বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে শেষ পর্যন্ত শ্রমিকের কর্মসংস্থানই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

এখানেই প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলন এবং পরিকল্পিত অরাজকতার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ জরুরি। কোনো শিল্পাঞ্চলে বাস্তব অসন্তোষ থাকলে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের উদ্দেশ্যে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে। শ্রমিকদের ক্ষোভ উসকে দেওয়া, গুজব ছড়ানো, আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করা কিংবা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিকে সহিংসতার দিকে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনার কথা বলা আর নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, দল বা সংগঠনকে দায়ী করা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতা ও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে কোনো পক্ষের রাজনৈতিক সুবিধা হতে পারে- এমন যুক্তি দিয়ে তাদের দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে তদন্তের বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা এবং নিরীহ শ্রমিকদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে চিহ্নিত না করা- দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিদ্ব›দ্বী। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার তথ্যভিত্তিক ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার; প্রবৃদ্ধি মাত্র ০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনামের রপ্তানি ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। কম্বোডিয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং ভারতের ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির মোট পরিমাণে বাংলাদেশ এখনও শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও প্রবৃদ্ধির গতিতে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে ক্যালেন্ডার বছর ২০২৫-এর হিসাবকে বাংলাদেশের অর্থবছরভিত্তিক পরিসংখ্যানের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।

বাংলাদেশের কোনো কারখানায় অস্থিরতা বা উৎপাদন ব্যাহত হলে ভারতসহ প্রতিযোগী দেশগুলো অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি শিল্পবিষয়ক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট, বন্দর জট, উৎপাদন ব্যয় ও দীর্ঘ সরবরাহ সময়ের কারণে কিছু ক্রয়াদেশ ভারতের দিকে সরে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বার্থে কোনো পক্ষ অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে- এমন সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। 

স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি বাংলাদেশের সামনে নতুন বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার। ২০২৪ সালে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১৯ বিলিয়ন ইউরো। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। উত্তরণের পরও অর্ন্তর্বর্তী সময়ের বাণিজ্যসুবিধা এবং শর্ত পূরণ সাপেক্ষে জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও সুশাসনসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এখন শুধু পণ্যের দাম ও মান নয়, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকের নিরাপত্তা, মজুরি ও কর্মপরিবেশ যাচাই করছেন। ফলে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার ধরে রাখার কৌশলগত শর্ত।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাও পোশাকশিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং, নিটিং ও বস্ত্র প্রস্তুতকারী পশ্চাদমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে শিল্প পুলিশের মূল্যায়নের বরাতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে ৪০০টির বেশি কারখানার উৎপাদন জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান শুধু পোশাকশিল্পের নয়, তবে শিল্প উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের ব্যাপকতা বোঝায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস ছাড়পত্র, সড়ক পরিবহন এবং পণ্য খালাসে বিলম্বও রপ্তানিকারকদের ব্যয় বাড়ায়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে পোশাক সরবরাহে ৬০ থেকে ৯৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগার অনুমান তুলে ধরা হয়েছে; তুলনায় ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে কম সময়ের কথা বলা হয়েছে। এসব সময়সীমা সব পণ্য বা সব কারখানার জন্য প্রযোজ্য নয়; পণ্যের ধরন, কাঁচামালের উৎস ও কারখানার সক্ষমতার ওপর তা নির্ভর করে। তবু এই তুলনা সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। কাঁচামাল আমদানি, ব্যাংকঋণের ব্যয়, পরিবহন, জ্বালানি ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি চাপে পড়ে।

এই অস্থিরতার অর্থনৈতিক অভিঘাতও বহুমাত্রিক। রপ্তানি আদেশ বাতিল বা পণ্য পাঠাতে বিলম্ব হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয় কমতে পারে, আমদানি সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির ব্যবস্থাপনা কঠিন হতে পারে। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকের আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়; একই সঙ্গে সুতা, কাপড়, প্যাকেজিং, পরিবহন, খাবার, আবাসন ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবসার চাহিদাও কমে যায়। রপ্তানি অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি বাড়তে পারে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল করতে পারে। তবে প্রতিটি শ্রমিক আন্দোলন বা স্বল্পমেয়াদি উৎপাদন বিঘœকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। মূল ঝুঁকি তৈরি হয় যখন বিরোধ নিষ্পত্তির স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যায়, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা দীর্ঘ সময় অচল থাকে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। প্রথমত, শিল্পাঞ্চলভিত্তিক বকেয়া বেতন, শ্রমিক অসন্তোষ ও শ্রম বিরোধ চিহ্নিত করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে দ্রæত নিষ্পত্তি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি কারখানায় শ্রমিক ও ব্যবস্থাপনার নিয়মিত সংলাপ, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্য মজুরি ও অন্যান্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ এবং শ্রম আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা অপরিহার্য। তৃতীয়ত, শ্রমিকদের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রযুক্তির আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা রক্ষায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবহন প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি উত্থাপন ও বিরোধ নিষ্পত্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে এবং সহিংসতা, ভাঙচুর ও উসকানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারি তদারকি, মালিকপক্ষের জবাবদিহিতা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমকেও যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে গুজব, অপপ্রচার ও উসকানি শিল্পের পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করতে না পারে।

পরিশেষে, তৈরি পোশাকশিল্পের স্থিতিশীলতা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা কারখানা সচল রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর জন্য প্রয়োজন ন্যায্য শ্রমসম্পর্ক, দায়িত্বশীল মালিকানা, শ্রমিকের অধিকার এবং কার্যকর সরকারি তদারকির সমন্বয়। শ্রমিকের ন্যায্য দাবি উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়, আবার সহিংসতা ও অরাজকতার মধ্য দিয়ে শ্রমিকের অধিকারও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। পারস্পরিক আস্থা, সংলাপ ও জবাবদিহির ভিত্তিতে শ্রমিকের মর্যাদা, শিল্পের উৎপাদনশীলতা এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষা করাই হলো সময়ের অভিন্ন দাবি।

মন্তব্য

মন্তব্য প্রকাশ করার জন্য সাইন ইন করুন