জাতীয়

চট্টগ্রামে গাছপালা, পাহাড় ও জলাশয় হারিয়ে বাড়ছে তাপের ঝুঁকি

চট্টগ্রামে গাছপালা, পাহাড় ও জলাশয় হারিয়ে বাড়ছে তাপের ঝুঁকি
চট্টগ্রামে গাছপালা, পাহাড় ও জলাশয় হারিয়ে বাড়ছে তাপের ঝুঁকি
এই সংবাদটি শুনুন বাংলা
1 মি.

চট্টগ্রামে গাছপালা, পাহাড় ও জলাশয় হারানোর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ। নগরায়ণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব সামনে আনছে বিষয়টি।

Table of Contents

    চট্টগ্রাম নগরে পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট ও গাছপালা কমে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভূমিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা। আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন শহরের তাপ নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার গবেষণাধীন এলাকার গড় ভূমিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে।

    প্রথম আলোর পরিবেশবিষয়ক প্রতিবেদনে পাহাড় ও জলাশয় হারানোর পাশাপাশি নগরায়ণের বিস্তার এবং অতিরিক্ত গরমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দারা এই পরিস্থিতিতে বেশি সমস্যায় পড়ছেন।

    পাহাড় ও জলাশয় কমছে, বাড়ছে কংক্রিটের বিস্তার

    চট্টগ্রামের আরেফিন নগর, পশ্চিম খুলশী ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি ও প্লট তৈরির চিত্র পাওয়া গেছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঢাল ও গাছপালা সরিয়ে সেখানে ঘরবাড়ি, সড়ক এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মিত হলে ভূমির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার ঘটনায় ১৩০টি মামলা হয়েছে।

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইদ্রিস আলমের গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০১৫ সালের জরিপে আগের প্রায় চার দশকে নগর থেকে ১২০টির বেশি পাহাড় হারিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। পাহাড় কেটে তৈরি করা জমির বড় অংশ পরবর্তী সময়ে বসতি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে।

    জলাশয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের জরিপে নগরে ৪ হাজার ২৯৫টি পুকুর ছিল। সর্বশেষ হালনাগাদ হিসাবে সেই সংখ্যা কমে ১ হাজার ৫১৯টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ প্রায় চার দশকে পুকুরের সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৭৭৬টি।

    গবেষণায় উঠে এসেছে ভূমিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত আরেক গবেষণায় ২০০১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নগরের জলাশয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, এ সময়ে জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৩ হাজার ১২৩ হেক্টর থেকে কমে ২ হাজার ৪৮৩ হেক্টরে নেমেছে। অর্থাৎ দুই দশকে প্রায় ৬৪১ হেক্টর জলাশয় হারিয়েছে নগরটি।

    ২০১১ ও ২০২৪ সালের উপগ্রহভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে করা আরেক গবেষণায় ভূপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৪৮ ও ৩৪ দশমিক ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পাওয়া গেছে। পার্থক্য প্রায় ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এটি আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাপা বাতাসের তাপমাত্রা নয়; এটি রাস্তা, ভবনের ছাদ, মাটি ও অন্যান্য ভূমিপৃষ্ঠ কতটা উত্তপ্ত হয়েছে, তার পরিমাপ।

    গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গাছপালা ছায়া দেয় এবং বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। জলাশয় ও সবুজ এলাকা সূর্যের তাপের প্রভাব কমাতেও ভূমিকা রাখে। বিপরীতে পিচঢালা সড়ক, ভবনের ছাদ ও কংক্রিট দিনের তাপ শোষণ করে পরে ধীরে ধীরে ছেড়ে দেয়। ফলে এসব এলাকায় সন্ধ্যার পরও গরম অনুভূত হতে পারে।

    তাপের চাপ বাড়ছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর

    অতিরিক্ত গরম শুধু স্বস্তি কমায় না, বাইরে কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনশ্রমিক ও দিনমজুরদের দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করতে হয় বলে তাপজনিত অবসাদ, পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি থাকে। চট্টগ্রামের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বড় গাছ ও খোলা জায়গার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

    চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এম এ সাত্তার প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, গরমের মাসগুলোতে ডায়রিয়া, কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা শীতের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে কাজ করা মানুষ বিশেষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।

    তবে চট্টগ্রামের তাপমাত্রা পরিবর্তনের একমাত্র কারণ স্থানীয় নগরায়ণ নয়। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনাও তাপমাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। শহরের সবুজ এলাকা ও জলাশয় কমে যাওয়ার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা যুক্ত হলে স্থানীয়ভাবে তাপের চাপ আরও বাড়তে পারে।

    নগর পরিকল্পনায় পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি

    চট্টগ্রামের তাপঝুঁকি মোকাবিলায় পাহাড়, পুকুর, দিঘি, গাছপালা ও খোলা জায়গা সংরক্ষণকে নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলাধার ভরাট ও পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কার্যকর করা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।

    প্রথম আলোর প্রতিবেদনে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি পাহাড় কাটা ও জলাধার ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং সংরক্ষণের ধারাবাহিকতার ওপর।

    চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি শহরের পরিবেশগত নিরাপত্তা শুধু নতুন ভবন ও সড়ক নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। প্রাকৃতিক জলাধার, সবুজ এলাকা ও পাহাড় রক্ষা করাও দীর্ঘমেয়াদে বসবাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।

    তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, পরিবেশ বিভাগ। মূল প্রতিবেদন: গাছপালা, পাহাড় ও জলাশয় হারিয়ে তাপের ফাঁদে চট্টগ্রাম।

    জগৎবার্তা

    জগৎবার্তা

    JagatBarta: আমাদের পৃথিবী যতটা সুন্দর ঠিক ততটাই রহস্যময়। রহস্যময় পৃথিবীতে অনেক কিছু আছে যেগুলো সম্পর্কে এখনো পুরোপুরি তথ্য পাননি বিজ্ঞানীরা। এইরকমি রহস্যময় গল্পকাহিনী নিয়ে সাজানো জগৎবার্তা চ্যানেলটি।

    33 টি আর্টিকেল প্রকাশিত

    View all posts by author
    Comments

    You must be logged in to post a comment.