জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হওয়ার ভারতের দীর্ঘদিনের দাবিতে প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এ সমর্থনের কথা জানান।
রাশিয়ার সমর্থন পেল ভারতের জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনের দাবি
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী আসনের দাবিতে রাশিয়ার সমর্থন
নিউইয়র্ক: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এবার প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে রাশিয়া। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ নিরাপত্তা পরিষদে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন। একই বক্তব্যে তিনি ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদের প্রার্থিতাকে সমর্থনের কথা জানান।
২৬ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন ল্যাভরভ। তাঁর বক্তব্যে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে জাতিসংঘের কাঠামোর সামঞ্জস্য আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। রাশিয়ার অবস্থান অনুযায়ী, সংস্কারের ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
ভারত ও ব্রাজিলের পক্ষে রাশিয়ার অবস্থান
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে তিনি ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদের প্রার্থিতাকে রাশিয়া সমর্থন করে বলে জানান। পাশাপাশি আফ্রিকা মহাদেশের স্বার্থও সংস্কার প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ল্যাভরভের বক্তব্যে একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর নতুন স্থায়ী আসন পাওয়ার সম্ভাবনার বিষয়ে রাশিয়ার আপত্তিও স্পষ্ট হয়। তিনি বিশেষভাবে জার্মানি ও জাপানের নাম উল্লেখ করে পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত স্থায়ী আসন দেওয়ার বিরোধিতা করেন। এটি মূলত নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে মস্কোর নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানের অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে বিশ্বের অর্থনৈতিক, জনসংখ্যাগত ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন এলেও পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের কাঠামোতে সেই পরিবর্তনের পূর্ণ প্রতিফলন হয়নি—এমন দাবি বহু দেশ ও জোটের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক অবস্থানেও এই বিতর্কের একটি দিক সামনে এসেছে। মস্কো এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলছে। ফলে ভারতের পাশাপাশি ব্রাজিল এবং আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও একই সংস্কার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বর্তমানে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে কারা রয়েছে?
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মোট ১৫টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এই পাঁচ দেশের প্রত্যেকেরই ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বাকি ১০টি আসন অস্থায়ী বা অস্থায়ী সদস্যদের জন্য নির্ধারিত এবং এসব সদস্য সাধারণ পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে দুই বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে।
নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার অর্থ শুধু দীর্ঘমেয়াদি সদস্যপদ পাওয়া নয়; এর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ভেটো ক্ষমতাও যুক্ত। এ কারণে পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ সম্প্রসারণের প্রশ্নটি জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ভারতের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা
ভারত বহু বছর ধরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবি জানিয়ে আসছে। দেশটির যুক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো বিশ্বের অন্যতম জনবহুল রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অবস্থান, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে এর ভূমিকা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। বিভিন্ন সময় ভারত নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছে।
সাম্প্রতিক সময়েও ভারতের দাবির প্রতি বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী সমর্থন জানিয়েছে। চলমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মরিশাস ভারতের প্রার্থিতার পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। পর্তুগালও নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ভারতের প্রতিনিধিত্বের পক্ষে কথা বলেছে।
এর আগে মধ্য ইউরোপের ভিশেগ্রাদ গ্রুপের চার দেশ—পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র—নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বৈঠকের সময় ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ থেকে ভারতের দাবির পক্ষে সমর্থনের বিষয়টি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সমর্থন থাকলেও সংস্কারের পথ সহজ নয়
কোনো দেশকে নতুন করে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য করার বিষয়টি শুধু কয়েকটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে না। নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য জাতিসংঘ সনদের সংশ্লিষ্ট বিধান সংশোধন করতে হয়। এর সঙ্গে সাধারণ পরিষদে প্রয়োজনীয় সমর্থন এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অনুমোদনের বিষয়ও জড়িত। বিশেষ করে বর্তমান পাঁচ স্থায়ী সদস্যের অবস্থান এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে ভারতসহ সম্ভাব্য নতুন স্থায়ী সদস্যদের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন বাড়লেও বাস্তবে সংস্কার বাস্তবায়ন একটি জটিল কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। স্থায়ী আসনের সংখ্যা কত হবে, কোন অঞ্চল কতটি আসন পাবে এবং নতুন সদস্যদের ভেটো ক্ষমতা থাকবে কি না—এসব প্রশ্নও আলোচনার অংশ।
রাশিয়ার সমর্থনের তাৎপর্য
রাশিয়া বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একটি। ফলে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রার্থিতার প্রতি মস্কোর প্রকাশ্য সমর্থন কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই বক্তব্যকে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হওয়ার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি জাতিসংঘ সংস্কার নিয়ে রাশিয়ার বর্তমান অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ্য দৃষ্টান্ত।
একই সঙ্গে রাশিয়ার বক্তব্যে উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে ভারতের প্রার্থিতার পাশাপাশি আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব নিয়েও ভবিষ্যৎ সংস্কার আলোচনায় নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হতে পারে।
জাতিসংঘ সংস্কার নিয়ে বৈশ্বিক আলোচনা
নিরাপত্তা পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার দাবি শুধু ভারতের একক বিষয় নয়। আফ্রিকার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যেও বর্তমান কাঠামো নিয়ে সংস্কারের আলোচনা রয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদেও পরিষদকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে।
এ অবস্থায় ভারতের পক্ষে রাশিয়ার সাম্প্রতিক সমর্থন নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার বিতর্কে একটি নতুন কূটনৈতিক বার্তা যোগ করেছে। তবে স্থায়ী সদস্যপদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
আমাদের পর্যবেক্ষণ (Editorial Note)
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক বিষয়। ভারতের পক্ষে রাশিয়ার সমর্থন এই আলোচনাকে নতুন গতি দিতে পারে, তবে চূড়ান্ত পরিবর্তন নির্ভর করবে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর সমঝোতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর।
You must be logged in to post a comment.