জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ্বের প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সরাসরি অংশ নিচ্ছেন। তবে চীন, রাশিয়া, জার্মানি, ইতালি, ভারত, মিশরসহ কয়েকটি দেশের শীর্ষ নেতারা এবার নিউইয়র্কে উপস্থিত হননি।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে অনুপস্থিত যেসব বিশ্বনেতা
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে অনুপস্থিত যেসব বিশ্বনেতা
নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। ২০২৬ সালের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান ও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সরাসরি উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণ বিতর্কের পর্ব ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে এবার আলোচনায় শুধু কারা নিউইয়র্কে এসেছেন তা নয়, বরং কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বনেতা সরাসরি অধিবেশনে উপস্থিত নেই, সেটিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। ডয়চে ভেলের ২৩ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ জনের বেশি নেতা এবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত থাকছেন না। অনুপস্থিতদের তালিকায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা রয়েছেন।
জার্মানির ফ্রিডরিখ মের্জ
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ এবার জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন না। তাঁর অনুপস্থিতির পেছনে মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা সামনে এসেছে। সেপ্টেম্বরে জার্মানির কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচনের ফলাফল দেশটির ক্ষমতাসীন খ্রিষ্টীয় গণতন্ত্রী দল বা সিডিইউর জন্য চাপ তৈরি করেছে বলে ডয়চে ভেলে জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মের্জ দেশের রাজনৈতিক বিষয়গুলো সামলাতেই ব্যস্ত থাকছেন। তাঁর পরিবর্তে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল জাতিসংঘে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও এবারের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত হননি। তাঁর অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে ইতালির অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় সামলানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মেলোনি এর আগে একাধিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তাঁর পরিবর্তে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জাতিসংঘের অধিবেশনে দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও এবার নিউইয়র্কে যাননি। সম্প্রতি তিনি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে বিশ্রাম ও সুস্থ হওয়ার জন্য সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাঁর কার্যালয় অবশ্য শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
রামাফোসার অনুপস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকার পক্ষে জাতিসংঘে বক্তব্য দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোনাল্ড লামোলা।
মিশরের আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি
মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিও এবারের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছেন না। তাঁর বদলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোস্তফা মাদবৌলি নিউইয়র্কে মিশরের প্রতিনিধিত্ব করছেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় তাঁর অনুপস্থিতির নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি।
২০১৪ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক বছর আল-সিসি নিয়মিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অংশ নিলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর সরাসরি উপস্থিতি দেখা যায়নি। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে অধিবেশন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় এবং পরের বছর হাইব্রিড ব্যবস্থায় আয়োজন করা হয়েছিল।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবু
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবুও এবারের সাধারণ পরিষদে উপস্থিত নেই। নাইজেরিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটি ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশিম শেত্তিমার মাধ্যমে জাতিসংঘে কার্যকরভাবে প্রতিনিধিত্ব করবে। টিনুবু বর্তমানে ছুটিতে রয়েছেন বলে তাঁর মুখপাত্রের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
ভারতের নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও এবারের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত হচ্ছেন না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে তাঁর সর্বশেষ সরাসরি বক্তব্য ছিল ২০২১ সালে। এরপর থেকে ভারত সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে দেশটির প্রতিনিধিত্বের জন্য পাঠিয়ে আসছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মোদির নাম এবারের বক্তাদের তালিকায় ছিল। পরে তাঁর সফর পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসে। তবে কেন তিনি শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে যাচ্ছেন না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে আলোচিত অনুপস্থিতদের একজন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে যাচ্ছেন না। তাঁর সফরসূচিতে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রীয় সফর রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর জাতিসংঘে অনুপস্থিতিকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে ব্যাখ্যা করেনি। তবে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং তাইওয়ানের নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনে নিউইয়র্কে উপস্থিত নেই। তাঁর পরিবর্তে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ দেশটির হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতিনের অনুপস্থিতির বিষয়ে একটি ডিক্রি জারি করা হলেও সেখানে কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পুতিনের সরাসরি উপস্থিতি আগেও তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে রাশিয়ার হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অংশগ্রহণ এবারও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে প্রত্যাশিত প্রতিনিধিত্বের একটি রূপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।
ফিলিস্তিনের মাহমুদ আব্বাস
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসও এবার সরাসরি নিউইয়র্কে উপস্থিত থাকতে পারছেন না। তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি অন্যদের তুলনায় ভিন্ন। ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাঁকে কূটনৈতিক ভিসা দেয়নি। ফলে তিনি সশরীরে জাতিসংঘে উপস্থিত হওয়ার পরিবর্তে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
গত বছরও তিনি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর ক্ষেত্রে ভিসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তটি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের প্রবেশাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব ও বিদ্যমান ব্যবস্থার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
এবারের অধিবেশনের প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো “Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”। এবারের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, মহামারি মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়নসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় রয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বর্তমানে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে এবং প্রত্যেক সদস্যরাষ্ট্রের একটি করে ভোট রয়েছে। ফলে কোনো রাষ্ট্রপ্রধান ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত না থাকলেও সংশ্লিষ্ট দেশ তার প্রতিনিধির মাধ্যমে আলোচনায় অংশ নিতে পারে। এবারের অধিবেশনেও অনুপস্থিত নেতাদের অনেকের পরিবর্তে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যায়ের প্রতিনিধিরা দায়িত্ব পালন করছেন।
উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিত নেতাদের তালিকা
- ফ্রিডরিখ মের্জ — জার্মানি
- জর্জিয়া মেলোনি — ইতালি
- সিরিল রামাফোসা — দক্ষিণ আফ্রিকা
- আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি — মিশর
- বোলা টিনুবু — নাইজেরিয়া
- নরেন্দ্র মোদি — ভারত
- শি জিনপিং — চীন
- ভ্লাদিমির পুতিন — রাশিয়া
- মাহমুদ আব্বাস — ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ
তবে এই তালিকাই সম্পূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ জনের বেশি বিশ্বনেতা এবারের অধিবেশনে সরাসরি উপস্থিত থাকছেন না। কারও অনুপস্থিতির পেছনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যস্ততা, কারও ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত কারণে বিশ্রাম, আবার কেউ ছুটিতে রয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে অনুপস্থিতির নির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
অনুপস্থিতির মধ্যেও চলছে কূটনৈতিক তৎপরতা
বিশ্বনেতাদের সরাসরি উপস্থিতি সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহের অন্যতম আকর্ষণ হলেও কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান না থাকলেই সেই দেশের কূটনৈতিক অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায় না। প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয়ে নিজ নিজ দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। জাতিসংঘের এবারের কর্মসূচিতে জলবায়ু, স্বাস্থ্য, উন্নয়ন ও শান্তি-নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
আমাদের পর্যবেক্ষণ (Editorial Note)
জাতিসংঘের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে কোনো দেশের শীর্ষ নেতা অনুপস্থিত থাকলে তা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। তবে ব্যক্তিগত উপস্থিতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিনিধি কী অবস্থান তুলে ধরছেন এবং বহুপক্ষীয় আলোচনায় দেশটি কতটা সক্রিয় থাকছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এবারের অনুপস্থিতিগুলো বিশ্ব কূটনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা ও বিভিন্ন দেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারের একটি চিত্র তুলে ধরছে।
You must be logged in to post a comment.